স্তন ব্যথা করে কেন

স্তন ব্যথা করে কেন? ক্যান্সার নাকি সাধারণ হরমোনজনিত সমস্যা?

নারীর শরীরের অন্যতম সংবেদনশীল অঙ্গ হলো স্তন বা ব্রেস্ট। জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্তনে ব্যথা অনুভব করেননি, এমন নারী খুঁজে পাওয়া ভার। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৭০% নারী তাদের জীবদ্দশায় তীব্র স্তন ব্যথায় ভোগেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সমস্যাকে বলা হয় ‘ম্যাস্টালজিয়া’ (Mastalgia)

অনেক নারী চেম্বারে এসে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “ডাক্তার, আমার বাম/ডান স্তনে চিনচিনে ব্যথা করছে, মাঝে মাঝে বগলের দিকেও ছড়িয়ে পড়ছে। এটা কি টিউমার বা ক্যান্সারের লক্ষণ?”

আজ আমি শুরুতেই আপনাদের একটি সুখবর দিতে চাই। আর তা হলো—স্তন ব্যথার ৯০ শতাংশ কারণই ক্যান্সার নয়। হরমোনের পরিবর্তন, ভুল মাপের অন্তর্বাস, কিংবা সাধারণ পেশীর টানের কারণেও এই ব্যথা হতে পারে।

আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা জানব—স্তন ব্যথার আসল কারণগুলো কী, কখন বুঝবেন এটি সাধারণ ব্যথা আর কখন বুঝবেন এটি বিপদের লক্ষণ, এবং ওষুধ ছাড়াই ঘরোয়া উপায়ে কীভাবে এই ব্যথা কমানো যায়।

স্তন ব্যথার ধরণ: আপনার ব্যথা কোনটি?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্তন ব্যথাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। আপনার ব্যথার ধরণ বুঝতে পারলে এর কারণ খুঁজে বের করা সহজ হবে।

১. সাইক্লিক্যাল পেইন (Cyclical Breast Pain)

এটি হলো স্তন ব্যথার সবচেয়ে সাধারণ ধরণ। প্রায় ৭০% নারীদের ব্যথা এই ক্যাটাগরিতে পড়ে।

  • বৈশিষ্ট্য: এই ব্যথাটি নারীদের মাসিক চক্রের (Menstrual Cycle) সাথে সরাসরি জড়িত।
  • কখন হয়: সাধারণত মাসিকের ৫-৭ দিন আগে থেকে ব্যথা শুরু হয় এবং মাসিক শুরু হলে বা শেষ হয়ে গেলে ব্যথা কমে যায়।
  • অনুভূতি: স্তন ভারী মনে হয়, ফুলে যায় এবং চিনচিনে ব্যথা করে। সাধারণত দুই স্তনেই ব্যথা হয়, বিশেষ করে ওপরের দিকে এবং বগলের কাছে।
  • কাদের হয়: ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীদের (যাদের মাসিক হয়) এটি বেশি দেখা যায়। মেনোপজের পর এই ব্যথা চলে যায়।

২. নন-সাইক্লিক্যাল পেইন (Non-cyclical Breast Pain)

এই ব্যথার সাথে মাসিকের কোনো সম্পর্ক নেই।

  • বৈশিষ্ট্য: এটি মাসের যেকোনো সময় হতে পারে এবং ব্যথা অনেক দিন ধরে স্থায়ী হতে পারে।
  • অনুভূতি: সাধারণত যেকোনো এক পাশের স্তনে হয়। ব্যথাটি তীক্ষ্ণ (Sharp), জ্বালাপোড়া বা খোঁচা লাগার মতো হতে পারে। অনেক সময় স্তনের একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে ব্যথা অনুভূত হয়।
  • কাদের হয়: এটি সাধারণত ৪০ বা ৫০ বছর বয়সী নারীদের (মেনোপজের আশেপাশে) বেশি হয়।

স্তন ব্যথা করে কেন? প্রধান কারণ (Full Detailed Guide)

কেন আপনার স্তনে ব্যথা হচ্ছে? এর পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। হরমোন থেকে শুরু করে ভুল মাপের ব্রা, এমনকি খাবারের অভ্যাসও এর জন্য দায়ী হতে পারে। চলুন, বিস্তারিত জেনে নিই চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে।

১. হরমোনের ওঠানামা ও পরিবর্তন (Hormonal Changes)

নারীদের শরীর হরমোনের ওপর নির্ভরশীল। মহিলাদের স্তন ব্যথার সবচেয়ে বড় ও প্রধান কারণ হলো শরীরে ইস্ট্রোজেন (Estrogen) এবং প্রোজেস্টেরন (Progesterone) হরমোনের ওঠানামা।

  • কেন ব্যথা হয়: প্রতি মাসে মাসিকের আগে এই হরমোনগুলোর মাত্রা বেড়ে যায়। এর প্রভাবে স্তনের দুগ্ধনালী (Ducts) এবং গ্রন্থিগুলোকে (Glands) বড় করে দেয় এবং শরীরে পানি জমিয়ে রাখে (Water Retention)। ফলে স্তন ফুলে যায়, টানটান হয় এবং ব্যথা করে। একেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সাইক্লিক্যাল পেইন’ বলা হয়।

  • কখন হয়:

    • মাসিকের আগে।

    • পিরিয়ড অনিয়মিত হলে।

    • কিশোরী অবস্থায় বা বয়ঃসন্ধিতে।

    • গর্ভধারণের প্রথম দিকে।

    • প্রি-মেনোপজ বা মেনোপজের সময়।

২. মাসিকের আগে স্তন ফুলে ব্যথা (PMS)

অনেক নারী PMS (Premenstrual Syndrome)-এর কারণে মাসিকের আগে স্তনে তীব্র ব্যথা ও ভারী লাগা অনুভব করেন। এটি সাধারণত দুই স্তনেই বেশি হয়। এটি ভয়ের কিছু নয়, বরং স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।

৩. গর্ভাবস্থা বা গর্ভধারণের শুরু (Pregnancy)

গর্ভধারণের প্রথম দিকেই স্তনে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হতে পারে। কারণ তখন—

  • প্রোজেস্টেরন হরমোন বৃদ্ধি পায়।

  • স্তনে দুধনালী (Milk duct) তৈরি হওয়া শুরু হয়। এটি গর্ভাবস্থার একটি স্বাভাবিক লক্ষণ।

৪. মেনোপজের সময় পরিবর্তন

৪০–৫০ বছরের নারীদের মেনোপজ বা মাসিক বন্ধ হওয়ার আগে হরমোন তীব্রভাবে ওঠানামা করে। এই কারণেও স্তনে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

৫. ভুল মাপের ব্রা ব্যবহার (Ill-fitting Bra)

বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বের প্রায় ৮০% নারী ভুল সাইজের ব্রা পরেন। অনেক নারী বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের ব্রা ফিটিং ভুল হচ্ছে।

  • খুব টাইট বা আন্ডারওয়্যার ব্রা: এটি বুকের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং রক্ত সঞ্চালনে বাধা দেয়। নিচে তার বা মেটাল দেওয়া ব্রা পাঁজরের হাড়ের ওপর চাপ দিয়ে ব্যথা সৃষ্টি করে।

  • খুব ঢিলা বা ঝুলে যাওয়া ব্রা: এটি স্তনকে সঠিক সাপোর্ট দিতে পারে না। ফলে হাঁটাচলা বা কাজের সময় স্তন টিস্যু ও লিগামেন্টে (Cooper’s Ligament) টান পড়ে ব্যথা হয়। বিশেষ করে যাদের স্তন বড়, তাদের এই সমস্যা বেশি হয়।

৬. স্তনে সিস্ট (Breast Cysts)

স্তনের ভেতরে পানিভর্তি ছোট ছোট থলি বা বেলুনের মতো অংশকে সিস্ট বলা হয়।

  • লক্ষণ: স্তনের ভেতরে আঙুর বা মার্বেলের মতো নরম চাকা অনুভব করা। মাসিকের আগে হরমোনের প্রভাবে এগুলো আকারে বড় হয় এবং ব্যথা করে। মাসিক শেষ হলে এগুলো মিলিয়ে যায়।

  • অনুভূতি: টানটান অনুভূতি, ব্যথা এবং ব্রেস্টে গাঁটের মতো লাগা। তবে আশার কথা হলো, বেশির ভাগ সিস্ট ক্যানসার নয় এবং বিপদজনক নয়।

৭. ফাইব্রোসিস্টিক ব্রেস্ট (Fibrocystic Breasts)

এটি কোনো রোগ নয়, বরং স্তনের এক ধরণের গঠন। অনেক নারীর স্তন টিস্যু প্রাকৃতিকভাবেই একটু দড়দড়ে বা ল্যাম্পি (Lumpy) হয়।

  • লক্ষণ: মাসিকের আগে পুরো স্তন জুড়ে ব্যথা হয় এবং মনে হয় ভেতরে ছোট ছোট অনেক চাকা আছে। প্রায় ৫০% নারীর এই ধরণের স্তন থাকে।

৮. ফাইব্রোএডেনোমা (Fibroadenoma)

এটি অল্প বয়সি নারীদের স্তনে পাওয়া খুব সাধারণ একটি গাঁট। সাধারণত এটি ব্যথাহীন হলেও অনেক সময় চাপ পড়লে বা আকার বড় হলে ব্যথা হতে পারে। এটিও ক্যানসার নয়।

৯. ব্রেস্টফিডিং বা স্তন্যদানজনিত সমস্যা 

যেসব মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান, তাঁদের বিভিন্ন কারণেই ব্যথা হতে পারে। যেমন:

  • বুকে দুধ জমে যাওয়া (Engorgement): সময়মতো দুধ না খাওয়ালে এটি হয়।

  • নালী ব্লক হওয়া (Blocked ducts): দুধের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে।

  • নিপলে ফাটল বা ক্ষত: ভুল পজিশনে খাওয়ানোর ফলে।

  • মাস্টাইটিস (Mastitis): স্তনে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে ইনফেকশন হলে স্তন লাল হয়ে যায়, গরম হয়ে যায়, তীব্র ব্যথা হয় এবং জ্বর আসে। অনেক সময় পুঁজ জমে ফোঁড়া (Abscess) হতে পারে।

১০. বুকের পেশীতে টান (Muscle Strain)

স্তন বা ব্রেস্ট সরাসরি বুকের পেশীর (Pectoral Muscle) ওপরে বসানো থাকে।

  • কারণ: আপনি যদি ভারী কিছু তোলেন, জিমে বুকের ব্যায়াম করেন, কাপড় কাচেন বা দীর্ঘক্ষণ একপাশে কাত হয়ে ঘুমান—তবে বুকের পেশীতে টান পড়তে পারে। এই পেশীর ব্যথাকে অনেকে ভুল করে স্তনের ভেতরের ব্যথা মনে করেন।

১১. কস্টোকন্ড্রাইটিস (Costochondritis) 

অনেক সময় বুকের হাড় বা পাঁজরের সংযোগস্থলে (হাড়ের সন্ধিস্থলায়) প্রদাহ হলে ব্যথা হয়।

  • লক্ষণ: বুকের হাড়ের পাশে যেখানে পাঁজরের হাড় যুক্ত হয়েছে, সেখানে ব্যথা হওয়া। জোরে শ্বাস নিলে বা ওই জায়গায় চাপ দিলে ব্যথা বাড়ে। এটি ব্রেস্টের প্রকৃত ব্যথা নয়, কিন্তু মনে হয় স্তনের নিচে বা ভেতরে ব্যথা হচ্ছে।

১২. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কিছু ওষুধ স্তন ব্যথা বাড়াতে পারে। যেমন:

  • হরমোনাল জন্মবিরতিকরণ পিল (Oral Contraceptives)।

  • ফার্টিলিটি বা বন্ধ্যত্বের ওষুধ।

  • হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি।

  • কিছু অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট বা মানসিক রোগের ওষুধ।

  • ব্লাড প্রেসারের কিছু ওষুধ।

১৩. অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও খাবারের প্রভাব

চা, কফি, চকোলেট এবং কোকাকোলা জাতীয় পানীয়তে ‘মিথাইলজ্যানথিন’ থাকে। এটি রক্তনালীকে প্রসারিত করে এবং স্তন ব্যথার উদ্রেক করতে পারে।

  • এছাড়া শরীরে ফ্যাটি অ্যাসিডের ভারসাম্য নষ্ট হলে হরমোনের সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়, যা ব্যথা বাড়ায়।

১৪. চর্বি বেশি হলে বা স্তন ভারী হলে

অনেক নারীর ক্ষেত্রে Breast Size বড় থাকলে ওজনের কারণে ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে হাঁটা, দৌড়ানো বা ব্রা ছাড়া থাকলে এই ব্যথা বাড়তে পারে।

১৫. ইনজুরি বা আঘাত 

বুকের ওপর সামান্য আঘাত, ধাক্কা বা চাপ পড়লেও সেই ব্যথা কয়েকদিন থাকতে পারে।

১৬. রেফার্ড পেইন (Referred Pain – অন্য অঙ্গের ব্যথা)

মাঝে মাঝে ব্যথাটা স্তনের নিজস্ব সমস্যা নয়, বরং শরীরের অন্য অঙ্গ থেকে আসে।

  • বাম দিকে ব্যথা: গ্যাস বা অ্যাসিডিটির কারণে ডায়াফ্রামে চাপ পড়লে বা হার্টের সমস্যায় বাম স্তনের নিচে ব্যথা হতে পারে।

  • ডান দিকে ব্যথা: পিত্তথলিতে পাথর বা সমস্যা থাকলে সেই ব্যথা ডান স্তনের নিচে বা ডান কাঁধে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

১৭. ব্রেস্ট ক্যানসার (Breast Cancer) ও সতর্কতা 

শুরুতেই বলে রাখি— স্তন ব্যথা সাধারণত ব্রেস্ট ক্যান্সারের লক্ষণ নয়। বুকের ব্যথা খুব কম ক্ষেত্রেই ক্যান্সারের কারণে হয়। তবে অবহেলা করা যাবে না। কিছু লক্ষণ থাকলে অবশ্যই পরীক্ষা করানো জরুরি:

  • স্তনে শক্ত অনড় গাঁট।

  • ব্রেস্টের আকৃতি বদলে যাওয়া।

  • নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া।

  • নিপল থেকে রক্ত বা দুধ ছাড়া অন্য কোনো স্রাব বের হওয়া।

  • স্তনের চামড়া কমলা লেবুর খোসার মত হয়ে যাওয়া।

পরামর্শ: যদি ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা উপরের কোনো জটিল লক্ষণ দেখা দেয়, তবে ভয় না পেয়ে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

স্তন ব্যথা মানেই কি ক্যান্সার ?

এটিই সেই প্রশ্ন যা নারীদের রাতের ঘুম হারাম করে দেয়। একজন কনসালটেন্ট হিসেবে আমি পরিষ্কার করে বলছি: স্তন ব্যথা ব্রেস্ট ক্যান্সারের সাধারণ লক্ষণ নয়।

  • ব্রেস্ট ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে টিউমারগুলো সাধারণত ব্যথাহীন (Painless) হয়। খুব শক্ত, পাথরের মতো চাকা থাকে কিন্তু ব্যথা থাকে না।
  • তবে, ইনফ্ল্যামেটরি ব্রেস্ট ক্যান্সার নামে এক ধরণের বিরল ক্যানসার আছে যাতে স্তন লাল হয়, ফুলে যায় এবং ব্যথা হয়।
  • ব্যথা নেই বলেই যে নিরাপদ, তা ভাববেন না। বরং ব্যথাহীন চাকা বা লাম্প ক্যানসারের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আর ব্যথাযুক্ত চাকা সাধারণত সিস্ট বা ইনফেকশন হয়।

ঘরোয়া উপায়ে স্তন ব্যথা কমানোর উপায়:

অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগেই জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে আপনি ব্যথা কমাতে পারেন।

১. সঠিক সাপোর্ট বা ব্রা

  • স্পোর্টস ব্রা ব্যবহার করুন। এটি স্তনকে নড়াচড়া থেকে রক্ষা করে এবং ব্যথা কমায়।
  • ব্রা কেনার সময় ফিতা দিয়ে মেপে সঠিক সাইজ কিনুন।
  • রাতে ঘুমানোর সময় ব্রা খুলে ঘুমান।

২. খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন

  • ক্যাফেইন বর্জন: কফি, কড়া চা এবং সফট ড্রিংকস খাওয়া কমিয়ে দিন বা বন্ধ করুন। অনেক রোগী শুধুমাত্র কফি ছেড়ে দিয়েই ব্যথা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
  • লবণ কম খান: মাসিকের ১ সপ্তাহ আগে থেকে তরকারিতে লবণের পরিমাণ কমিয়ে দিন এবং কাঁচা লবণ খাবেন না। লবণ শরীরে পানি ধরে রাখে, যা স্তন ফোলা ভাব বাড়ায়।
  • ফ্যাট কমান: চর্বিযুক্ত খাবার কমালে শরীরে ইস্ট্রোজেন নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৩. গরম বা ঠান্ডা সেঁক

  • ঠান্ডা সেঁক: স্তন খুব ফুলে গেলে বা আঘাত পেলে আইস প্যাক দিয়ে ১০ মিনিট সেঁক দিন।
  • গরম সেঁক: মাসিকের আগে ভারী ভাব কমাতে বা পেশীর টানে গরম তোয়ালে বা হট ওয়াটার ব্যাগ ব্যবহার করুন।

৪. প্রাকৃতিক সাপ্লিমেন্ট

  • ইভিনিং প্রিমরোজ অয়েল (Evening Primrose Oil): এটি স্তন ব্যথা কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। এতে গামা-লিনোলেনিক এসিড (GLA) থাকে যা ফ্যাটি অ্যাসিডের ভারসাম্য ঠিক করে।
  • ভিটামিন ই: এটি সিস্ট বা ফাইব্রোসিস্টিক ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
  • তিসির বীজ (Flaxseeds): এতে থাকা ওমেগা-৩ প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

৫. রিলাক্সেশন

স্ট্রেস বা মানসিক চাপ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। মেডিটেশন বা ইয়োগা করলে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে থাকে। ক্যাস্টর অয়েল দিয়ে হালকা ম্যাসাজ করলেও আরাম পাওয়া যায়।

রোগ নির্ণয়: ডাক্তার কি পরীক্ষা করবেন?

ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি প্রথমে আপনার ইতিহাস জানবেন এবং স্তন পরীক্ষা (Physical Exam) করবেন। এরপর প্রয়োজনে নিচের পরীক্ষাগুলো দিতে পারেন:

  • আল্ট্রাসোনোগ্রাম (USG): ৩৫ বছরের কম বয়সী নারীদের জন্য এটি করা হয়। এতে সিস্ট বা টিউমার ধরা পড়ে।
  • ম্যামোগ্রাম (Mammogram): ৩৫ বা ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের জন্য এটি স্তনের এক্স-রে। এটি ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের জন্য সেরা।
  • বায়োপসি: যদি কোনো চাকা সন্দেহজনক মনে হয়, তবে সুই দিয়ে কোষ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।

স্তনে ব্যথার সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

ডিওডোরেন্ট বা বডি স্প্রে ব্যবহার করলে কি ব্যথা বা ক্যান্সার হয়?

উত্তর: না। এটি একটি ভুল ধারণা। ডিওডোরেন্টের সাথে স্তন ব্যথা বা ক্যান্সারের কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

গর্ভাবস্থায় স্তন ব্যথা কি স্বাভাবিক?

উত্তর: হ্যাঁ, গর্ভাবস্থায় হরমোনের প্রভাবে দুধ তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে স্তন বড় ও সংবেদনশীল হয়ে যায়। বিশেষ করে প্রথম ৩ মাস ব্যথা হতে পারে। এটি ভয়ের কিছু নয়।

পুরুষদের কি স্তন ব্যথা হতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ। পুরুষদের শরীরে হরমোন ইমব্যালেন্স হলে স্তন টিস্যু বেড়ে যেতে পারে (Gynecomastia)। এর ফলে পুরুষদেরও স্তনে ব্যথা বা চাকা হতে পারে।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?

যদিও অধিকাংশ ব্যথা সাধারণ কারণে হয়, তবুও কিছু লক্ষণ দেখলে দেরি করা উচিত নয়:

১. স্থায়ী ব্যথা: যদি ব্যথা ২-৩ সপ্তাহের বেশি থাকে এবং মাসিকের পরেও না কমে।
২. নির্দিষ্ট পয়েন্টে ব্যথা: যদি পুরো স্তনে ব্যথা না হয়ে, একটি নির্দিষ্ট জায়গায় তীব্র ব্যথা থাকে।
৩. চাকা বা লাম্প: ব্যথার সাথে যদি কোনো শক্ত চাকা অনুভব করেন যা নড়াচড়া করে না।
৪. নিপল পরিবর্তন: স্তনবৃন্ত বা নিপল দিয়ে রক্ত বা পুঁজের মতো তরল বের হলে।
৫. ইনফেকশন: স্তন লাল হয়ে গেলে, গরম হয়ে গেলে বা জ্বর আসলে।
৬. বয়স: মেনোপজের পর যদি নতুন করে স্তনে ব্যথা শুরু হয়।

উপসংহার:

স্তনে ব্যথা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা, যা নারী জীবনের হরমোনচক্রের একটি অংশ। ব্যথা হলেই “ক্যান্সার হলো” ভেবে আতঙ্কিত হবেন না। বরং নিজের শরীরের যত্ন নিন।

সঠিক মাপের অন্তর্বাস পরুন, ক্যাফেইন বর্জন করুন এবং পুষ্টিকর খাবার খান। তবে ব্যথার সাথে যদি চাকা থাকে বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখেন, তবে লজ্জা না পেয়ে দ্রুত একজন ব্রেস্ট স্পেশালিস্ট বা সার্জনের পরামর্শ নিন।

সচেতনতাই সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি। সুস্থ থাকুন, নিজেকে ভালোবাসুন।

 

(বিঃদ্রঃ এই ব্লগটি সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা ও তথ্যের জন্য লেখা হয়েছে। এটি কখনোই সরাসরি ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়। কোনো সমস্যা মনে হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।)

Scroll to Top